খুলনার মুক্তিযুদ্ধের প্রথম পর্ব
গুজবের পর গুজব ছড়িয়ে পড়ছে। খুলনা শহরে ঘরে ঘরে, ক্লাবে-মজলিসে আর চায়ের দোকানে নানারকম জল্পনা-কল্পনা চলছে। গত কয়েকদিন ধরে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সঙ্গে শেখ মুজিবের আলাপ-আলোচনা চলছিল। এই আলোচনার পরিণতি কি ঘটতে পারে, সেই প্রসঙ্গ নিয়ে খুলনা শহরের মানুষ যেন উত্তেজনায় ফেটে পড়ছিল। শুধু খুলনা নয়, সারা বাংলাদেশের মানুষের মন চঞ্চল হয়ে উঠেছিল। তাদের মনের ব্যারোমিটারে আশা-নিরাশার চাপমাত্রা ক্ষণে ক্ষণে উঠছিল আর নামছিল। অবশেষে শেষ সংবাদ এলো, সকল জল্পনা-কল্পনা অবসান ঘটিয়ে আলোচনা ভেঙে গেছে। এবার কি ঘটবে?
ঘটনার পরিণতি দেখে এবার এটা সবার কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, এতদিন পেছনে একটা গভীর জটিল ষড়যন্ত্রের ফাঁদ পেতে ওরা প্রকাশ্য রঙ্গমঞ্চে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ সংবিধান সম্পর্কে আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিল। ওরা ওদের হিংস্র নখরগুলিকে শান্তিপূর্ণ আলাপ-আলোচনার নরম দস্তানার আবরণের নীচে ঢেকে রেখে শেখ মুজিবের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিল। অবশ্য আগেই একটা খবর পাওয়া গিয়েছিল, ওরা বাংলাদেশের শাসন-ক্ষমতা এখানকার সত্যিকারের প্রতিনিধিদের হাতে কিছুতেই ছেড়ে দেবে না। সেই উদ্দেশ্য সামনে রেখেই ওরা সশস্ত্র অভিযানের জন্য প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছে। জাহাজ ভর্তি করে সৈন্য ও অস্ত্রশস্ত্র আসছেই, শুধু সন্দেহ বা অনুমানের কথা নয়, এটা প্রত্যক্ষ বাস্তব সত্য। তা-সত্ত্বেও মানুষের আশা মরেও মরতে চায় না। তাই এখানকার রাজনৈতিক নেতারা এবং তাঁদের সাথে সাথে বাংলাদেশের লোকেরা এই আশাটুকু ছাড়তে পারে নি যে, শেষপর্যন্ত এই আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে একটা শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ খুলে যেতেও পারে। কিন্তু এবার তাদের সেই আশায় ছাই পড়ল।
২৫-এ মার্চ। পরিস্থিতি গুরুতর, সেটা সবাই বুঝতে পারছে। আবহাওয়া ক্রমেই যেন ভারী হয়ে আসছে। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা অবস্থাটা বুঝবার জন্য ঢাকার সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করছিলেন। কিন্তু রাত্রি আটটার সময় ফোনের যোগাযোগ একেবারেই বন্ধ হয়ে গেল। তখনি তাঁদের মনে সন্দেহ জাগল, ঢাকার অবস্থা ভাল নয়, একটা কিছু অঘটন ঘটতে চলেছে।
কর্মীদের চোখে ঘুম নেই। রাত্রি ১২টার সময় একটা ঘোষণার শব্দ শুনে তারা চমকে উঠল। শুধু তারাই নয়, সারা শহরের ঘুমন্ত মানুষ শয্যা ছেড়ে উঠে বসেছে। সরকারী ঘোষণাকারীরা সারা শহরে ঘুরে ঘুরে মাইক-যোগে প্রচার করে ফিরছে যে, আগামী কাল ২৬-এ মার্চ সকাল পাঁচটা থেকে সারা শহরে ৭২ (বাহাত্তর) ঘণ্টা পর্যন্ত কারফিউ জারী করা হচ্ছে। এই সময়ের মধ্যে যদি কেউ ঘর ছেড়ে পথে বেরোয় তবে তাকে সঙ্গে সঙ্গে গুলি করা হবে।
বিচিত্র এই ঘোষণা। আজ রাত্রিতে কারফিউ নেই; কারফিউ শুরু হবে কাল সকাল থেকে। এই ধরনের ঘোষণা আর কখনো শোনা যায় নি। অনেকেই অনুমান করল, ঢাকা শহরে অথবা আর কোথাও অবশ্যই একটা কিছু শুরু হয়ে গেছে এবং তার জের সারা প্রদেশময় ছড়িয়ে পড়বে। কিন্তু প্রথম আক্রমণ করেছে কারা-পাকিস্তানের জঙ্গী বাহিনী না মুক্তিকামী জনগণ?
ইতিমধ্যে সবার অগোচরে আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে গেছে। সেটা ঘটেছে কারফিউ জারী করার বেশ কিছু আগেই। এটা একটা আশাতীত সু-খবর। আজই রাত্রিতে ই. পি. আর. বাহিনীর জনৈক পাঞ্জাবী অফিসার তাঁর কয়েকজন প্রিয়পাত্রকে এই বলে হুঁশিয়ারী দিয়েছিলেন যে, ই. পি. আর.-এ লোকদের সামনে এক ভীষণ বিপদ ঘনিয়ে এসেছে, যদি প্রাণে বাঁচতে চাও আর দেরী না করে এখনি পালিয়ে যাও। স্থানীয় ই. পি. আর. বাহিনীতে প্রায় তিন শত জন লোক। খবরটা তাদের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ল। দেখতে দেখতেই ই. পি. আর. লাইন খালি হয়ে গেল। তারা রাতের অন্ধকারে সেই স্থান ত্যাগ করে সুশৃঙ্খলভাবে দূরবর্তী গ্রামাঞ্চলে আশ্রয় নিল। অপর দিকে কারফিউ জারী হবার পর অবস্থা সঙ্গীন বুঝতে পেরে শহরের পুলিশরাও তাদের ব্যারাক ছেড়ে পালিয়েছে।
গভীর উত্তেজনার
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments